Monday, September 27, 2010

ধর্মীয় মুখোশে রাজনৈতিক আন্দোলনই হিন্দুত্ববাদ - তপন রায়চৌধুরী

মরা ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসনের কাছে অনেকগুলি ব্যাপারে ঋণী। তার মধ্যে অন্যতম, রাষ্ট্রব্যবস্থার তিনটি প্রধান খুঁটির পরস্পর ব্যবধান। ইংরেজের অলিখিত সংবিধানের প্রধান ভিত্তি শাসনযন্ত্রের তিনটি প্রধান অঙ্গের পরস্পর স্বাতন্ত্র্য। নির্বাচিত বিধানসভা, নিয়োজিত সরকারি কর্মচারী তথা মন্ত্রিমণ্ডলী আর বিচারব্যবস্থা...প্রত্যেকে স্বাধীন, পরস্পরের কাজে বা অধিকারে হস্তক্ষেপ করে না।
কথাটা সর্বাংশে সত্যি নয়। আইনব্যবস্থা তথা আদালত সংবিধানের ব্যাখ্যা করতে অধিকারপ্রাপ্ত। সেই ব্যাখ্যার মারফত তারা পার্লামেন্টের পরিবর্তিত আইনকে বেআইনি ঘোষণা করতে পারে। কর্মচারী বা মন্ত্রীদের কার্যবিশেষও আইনবিরুদ্ধ হলে নিষেধ করতে পারে। এই সাংবিধানিক আদর্শ ভারতবর্ষ মেনে নিয়েছে।
ভারতীয় রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ভিতরে আইনের আপেক্ষিক প্রাধান্য লক্ষণীয়। সংবিধান ব্যাখ্যা করার চরম অধিকার উচ্চতম আদালত সুপ্রিম কোর্টের হাতে। এই অধিকার সংবিধান এবং নাগরিকদের আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাম্প্রতিক কিছু সমীক্ষা থেকে আমরা জানতে পারি যে, শতকরা ৭২ জন ভারতীয় আইনব্যবস্থায় আস্থাবান। সে ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীরা শতকরা ৫৬ জনের বিশ্বাসভাজন আর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শতকরা ৪২ জনের। দুর্নীতি আমাদের আদালতগুলিকে স্পর্শ করেছে, তা সত্ত্বেও! তা ছাড়া পর্বতপ্রমাণ মামলা ঝুলে আছে: নিম্ন আদালতে ২ কোটি ৪৮ লক্ষ আর সুপ্রিম কোর্টে সাড়ে ৩৬ লক্ষ।


বজ্রমুষ্টি! অযোধ্যা, ১৯৯২।

সাম্প্রতিক কালে, মানে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে হিন্দুত্ববাদের ক্ষমতা বাড়ার ফলে রাষ্ট্রজীবনের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক আমাদের ইতিহাসে একটি প্রধান বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বইটি এই প্রসঙ্গে আমাদের উচ্চতম আদালত, সুপ্রিম কোর্টের অবদান বিষয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। বইটি ‘ল ইন ইণ্ডিয়া’ সিরিজের অন্তর্গত, কিন্তু এটি মূলত আইনবিষয়ক বই মনে করলে ভুল হবে। আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষের রাজনীতিক, সামাজিক, বৌদ্ধিক এবং অবশ্যই আইনের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এর বক্তব্যগুলির গভীর প্রাসঙ্গিকতা আছে।
ভারতবর্ষ ‘ধর্মনিপেক্ষ রাষ্ট্র’। এই বর্ণনার অর্থ কিন্তু ‘একম্‌ অদ্বিতীয়ম্‌’ নয়। মার্কিন মুলুকের অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ জনগণ সাধারণ (পাবলিক) এবং ব্যক্তিগত (প্রাইভেট) এই দুই জগতের সম্পূর্ণ পরস্পর বিচ্ছিন্নতায় বিশ্বাসী এবং ধর্মকে তাঁরা ব্যক্তিগত ব্যপার বলেই মেনে নিয়েছেন। ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বা ‘সেকুলার’ বলে ঘোষণা করলেও অনেক ক্ষেত্রেই ধার্মিক ব্যাপারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইংল্যাণ্ডের মহারানির অন্যতম উপাধি ধর্মের (অর্থাৎ অ্যাংলিকান খ্রিস্টধর্মের) রক্ষক, ‘ডিফেণ্ডার অব ফেথ’। ধর্মবিশ্বাসের জন্য নিপীড়ন ও দেশে অজানা নয়, যদিও উনবিংশ শতাব্দী থেকে সে কুপ্রথা লুপ্ত হয়েছে।
ভারতবর্ষে ধর্মনিরপেক্ষতার দুই অর্থ হয়: এক সর্ব ধর্ম সমভাব। দ্বিতীয়, ধর্ম ব্যাপারে রাষ্ট্রের সর্ম্পূণ ঔদাসীন্য। এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যার নানা ব্যতিক্রম কিন্তু সংবিধানেই পাওয়া যায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের সংস্কারের ব্যাপারে রাষ্ট্র প্রচুর ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেছেন। ধর্মীয় সম্পত্তি তথা মন্দির-মসজিদ চালনার ব্যাপারে রাষ্ট্রনিযুক্ত কর্মচারীর অনেক ক্ষেত্রে চরম ক্ষমতা। এমনকী, আসল ধর্ম কী আর কী নয় সেই সিদ্ধান্ত করার অধিকারও আদালত মারফত রাষ্ট্রের হাতে।
সর্বোচ্চ আদালতের রায় আমাদের জনজীবনের ছয়টি ক্ষেত্রে কী ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, রণজয় সেন তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথম, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ওই স্বাধীনতাবিষয়ক আইন নীতি। দ্বিতীয়, হিন্দু ধর্মের সংজ্ঞা এবং কে হিন্দু, তা নির্ধারণ। তৃতীয়, সংবিধানের আশ্রয়ে ধর্মের মূল কথা। চতুর্থ, সংবিধানের আইনগত ব্যাখ্যা সংবিধানের স্রষ্টাদের বিশ্ববোধের সঙ্গে মিলছে কি না। পঞ্চম, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির উপর এই ব্যাখ্যার অভিঘাত কী? ষষ্ঠ, ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আইনি ব্যাখ্যার অভিঘাত।
জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারতরাষ্ট্র কোন আদর্শের অভিমুখী হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গে লেখকের বক্তব্য দুটি। প্রথম কথা, আমাদের রাষ্ট্রগঠন প্রচেষ্টা এক অত্যাধুনিক মনোভঙ্গির প্রকাশ। বুদ্ধিদীপ্ত, সম্পূর্ণ যুক্তিভিত্তিক বিজ্ঞানানুগ এক বিশ্বদর্শন তার ভিত্তি। যুক্তিবিরুদ্ধ কোনও আপ্তবাক্য তার কাছে গ্রাহ্য নয়। এবং এই দৃষ্টিভঙ্গিরই অবশ্যম্ভাবী ফল সমাজসংস্কার প্রচেষ্টা। আর সেই প্রচেষ্টার প্রেরণা বঞ্চিত অবহেলিত অত্যাচারিত মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি। তবে প্রচেষ্টাটি সর্বত্রগামী হয়নি। সংবিধানস্রষ্টারা ভেবেছিলেন, তাঁরা যখন অধিকাংশ ভারতীয়ের আস্থা অর্জন করেছেন তখন সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ তাঁদের পরিবর্তনের ফরমান দিয়েছেন। সুতরাং হিন্দু সমাজের মৌলিক সংস্কার তাঁদের এক্তিয়ারের মধ্যে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই অধিকার তাঁদের আছে কি না সেই বিষয়ে তাঁদের পূর্ণ আস্থা ছিল না। ফলে সংস্কার-প্রচেষ্টা হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আর সংবিধান অনুযায়ী হিন্দু বলতে মুসলমান, খ্রিস্টান, পার্সি এবং ইহুদি ছাড়া সকলকেই বোঝায়। শেষোক্ত সংজ্ঞা যে আজ অচল, তার প্রমাণ শিখদের আন্দোলন।
উপরোক্ত আলোচনায় যে চিন্তাধারার প্রকাশ, তার এক প্রাগ-ইতিহাস আছে। রামমোহনের সময় থেকে শিক্ষিত ভারতীয়রা সত্যিকার হিন্দু ধর্ম কী সেই আলোচনায় ব্যাপৃত— কতকটা মিশনারিদের বিকৃত সমালোচনার ফলে। রামমোহন বললেন, ‘হিন্দুধর্মের মূল কথা বেদ, অর্থাৎ বেদান্ত, অর্থাৎ একমেবাদ্বিতীয়ম্‌ ব্রহ্মের উপাসনা।’ পরে রামকৃষ্ণ-শিষ্য বিবেকানন্দ একই কথা বললেন।
মিশনারিদের প্রচারিত পৌত্তলিকতার অপবাদের বিরুদ্ধে এই প্রচার। আর বিবেকানন্দ তাঁর গুরুর জীবনে ‘যত মত তত পথ’ এই তত্ত্বের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেলেন। রামমোহন বেদান্ত ছাড়া হিন্দু ঐতিহ্যের অন্য যাবতীয় ধারা ‘এহ বাহ্য’ বলে বর্জন করলেন। বিবেকানন্দ পৌত্তলিকতার মূলে প্রতীক পূজা এ সম্বন্ধে সচেতন হয়েও বেদান্ত ধর্মই প্রচার করলেন। রামমোহন এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী সর্বমানবের ঐক্যের ভিত্তিতে সভা স্থাপন করলেন। বিবেকানন্দ-স্থাপিত রামকৃষ্ণ মিশন বেদান্তদর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত হল। একেশ্বরবাদীদের সঙ্গে সহমর্মিতার ভিত্তিতে দুই ধর্মনেতাই হিন্দুদের অন্তহীন উদারতার বাণী শোনালেন। রামমোহন সতীদাহ-বিরোধী আন্দোলনের মারফত ধর্ম-তথা-সমাজসংস্কারের প্রচেষ্টা করেন আর বিবেকানন্দ যাবতীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিলেন।
আধুনিক হিন্দু ধর্মের উপরোক্ত ধারার অন্যতর লক্ষণ সর্বব্যাপকতা, সর্বধর্মসহিষ্ণুতা, সব ধর্ম মূলে এক এই চিন্তা। নয়া হিন্দু ধর্মের আর একটি রূপ ছিল, যার প্রকাশ বঙ্কিমচন্দ্রে, দয়ানন্দ স্বামী-স্থাপিত আর্যসমাজে। দয়ানন্দ বেদে, বঙ্কিম গীতায়, কৃষ্ণচরিত্রে ‘খাঁটি’ হিন্দু ধর্মের সন্ধান পান। কিন্তু ওঁদের সর্বধর্মে সমভাবের ফর্দ থেকে ইসলাম বাদ পড়ে। কারণ ওঁদের চোখে ওটি অত্যাচারী বিজেতার ধর্ম। আধুনিক হিন্দু ধর্মের এই দুই ধারার বর্তমান পরিণতি আশা করি, চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো নিষ্প্রয়োজন। বিংশ শতাব্দীতে সাভারকর উল্লিখিত দ্বিতীয় ধারাটির অনুসরণ করে হিন্দুত্বের বাণী ঘোষণা করলেন: ‘হিন্দু কে? যার কাছে ভারতবর্ষ শুধু জন্মভূমি না পুণ্যভূমিও, সেই হিন্দু এবং ভবিষ্যতের স্বাধীন ভারতরাষ্ট্র হিন্দু হতে হবে।’ আর এক পা এগিয়ে গোলওয়ালকর বললেন, ‘অহিন্দুদের ওই রাষ্ট্রে হিন্দুদের সেবা ছাড়া অন্য কোনও অধিকার থাকবে না।’
রাধাকৃষ্ণন তাঁর প্রামাণ্য বইগুলিতে প্রথম ধারাটিরই অনুগমন করলেন। শোনা যায়, শেষ জীবনে নেহরু তাঁর কাছে বেদান্তের পাঠ নিতেন। ‘অজ্ঞেয়বাদী’ পণ্ডিতজি অন্তিম ইচ্ছাপত্রে অনুরোধ জানান, যেন তাঁর দেহভস্ম গঙ্গাবারিতে নিক্ষিপ্ত হয়, কারণ হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি দেশবাসীর দেহাবশেষ ওই পুণ্য উদকেই আশ্রয় পেয়েছে। যে চিন্তাধারা আমাদের সংবিধানে ব্যক্ত, লেখক তাকে অত্যাধুনিক বলে ব্যাখ্যা করলেও কোথায় যেন একটা পিছুটান রয়ে গিয়েছে। যার অভিব্যক্তি জওহরলালের নিজের জীবনে।
এখানে একটা কথা সম্ভবত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। হিন্দু ধর্মের অন্তহীন উদারতা, সর্বংসহা আদর্শ বিষয়ে দু’ একটি প্রশ্ন উঠতে পারে। ভক্তিবাদীদের কাছে বেদান্ত, ন্যায় কাকের কর্কশ চিৎকার, গৌড়ীয় তন্ত্রে চৈতন্য-নিত্যানন্দ-অদ্বৈত তিন অসুর, শশাঙ্ক-কর্তৃক বোধিদ্রুম উৎপাটনের, অজাতশত্রু পিতার ধর্ম শোণিতের স্রোতে মুছে ফেলার, শঙ্করাচার্যের কাছে তর্কে হেরে বৌদ্ধ পণ্ডিতদের আত্মহননের কাহিনির পিছনে কোনও সত্য ইতিহাসের ছায়া সম্ভবত আছে। আর দাক্ষিণাত্যে জৈনদের মুণ্ডচ্ছেদের ইতিহাস পাথুরে না হোক, তামাটে প্রমাণসিদ্ধ।
তবু পাশ্চাত্য শিক্ষা আর জাতীয় আত্মগৌরব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যে বিশ্ববোধে পরিণতি পেয়েছিল তার অভিঘাত ইতিবাচক। ভারতীয়, বিশেষত হিন্দুদের জীবন ওই দৃষ্টিভঙ্গীর ফলে আলোকিত হয়ে ওঠে।
ধর্মের সঙ্গে আইনের সম্পর্ক ইংরেজ আমলে তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। হিন্দুদের স্মৃতিশাস্ত্র এবং মুসলমানদের শরিয়া ব্যক্তিগত, বিশেষত সম্পত্তিসংক্রান্ত আইনের ব্যাপারে ভিত্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। সম্প্রতি নন্দিনী ভট্টাচার্য পাণ্ডা ‘হিন্দু আইন’ কতটা স্মৃতিভিত্তিক সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উনি দেখিয়েছেন যে, শাসনগত নীতি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখে এই আইনের বিবর্তন যতটা হয়েছে, শাস্ত্রের অনুশাসন মেনে ততটা নয়। পরে সতীদাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা, বিধবাবিবাহ আইনসঙ্গত করা শাস্ত্রের দোহাই দিয়েই হয়েছিল। যদিও এই সব ব্যবস্থা প্রচলিত প্রথার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে।
স্বাধীন ভারতে আইন নির্দ্বিধায় সংস্কারমুখী হয়ে ওঠে। ষাটের দশকে সুপ্রিম কোর্টের নেহরুপন্থী বিচারক গজেন্দ্র গড়করের ধর্মসংক্রান্ত রায়গুলি এই ক্ষেত্রে প্রধান স্থানীয়। এই সব রায়ে হিন্দু ধর্ম বলতে কী বোঝায়, সেই বিষয়েও সিদ্ধান্ত রয়েছে। সৎসঙ্গীরা তাঁদের মন্দিরগুলির উপর অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য দাবি করেন যে, তাঁরা হিন্দু নন। বিচারালয়ের উত্তর: হিন্দুধর্ম জীবনের একটি পথ (ওয়ে অব লাইফ), আচারের উপর নির্ভরশীল নয়। (কথাটা কি সত্যি? হিন্দু নাস্তিকও হতে পারেন। কিন্তু আচার না মানলেই জাতিচ্যুত হবেন) রামকৃষ্ণ মিশন যখন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দাবি করেন, তাঁরাও অনুরূপ উত্তর পান। এই ভাবে আইনগত রায় মারফত সংবিধানের মূলীভূত চিন্তাধারা জোরালো করা হয়।
কিন্তু আশির দশক থেকে হিন্দুত্ববাদের প্রাদুর্ভাব হয় এবং পরোক্ষে সুপ্রিম কোর্টের বিচারেও তার ছায়া পড়ে। এই প্রসঙ্গে হিন্দুত্বের আবির্ভাবের সামাজিক-রাজনীতিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
হিন্দুত্ববাদ আসলে ধর্মীয় মুখোশে রাজনৈতিক আন্দোলন। সমাজের নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এক অংশ, যাঁরা তুলনায় ‘প্রগতিশীল’ মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন, তাঁরা নানা চাপের মুখে পড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠদের অতিরিক্ত সুযোগসুবিধা দাবি করতে শুরু করেন। মালয়েশিয়া বা পাকিস্তানের মতো দেশে ও বস্তু অজানা নয়। কিন্তু বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতির দেশ ভারতবর্ষ সহাবস্থানের পথ বেছে নিয়েছিল। ‘সেকুলারিজম’ বা ধর্মনিরপেক্ষতা তারই অন্য নাম। ফলে অনেকেই এই আন্দোলনে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখলেন। বিশেষত রাম জন্মভূমি জাতীয় ধর্মীয় আন্দোলনে তাঁরা এর বিশেষ সম্ভাবনা দেখলেন।
বাল ঠাকরের নির্বাচনসংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আবারও বললেন, ‘হিন্দু ধর্ম জীবনযাত্রার একটি পথ, কিন্তু হিন্দুত্ব আর হিন্দু ধর্ম একই কথা। নির্বাচনী প্রচারে ওই সব শব্দ ব্যবহার দোষের কিছু নয়।’
ধর্ম ও আইনের সম্পর্ক বিষয়ে লেখকের শেষ কথা ওঁর ভাষাতেই বলি, ‘এই বই ধর্মের নির্বিচার স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল নয়...একই সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ধর্মসংক্রান্ত অনেক বিষয়েই রায় দিচ্ছেন...যা আইনি ক্ষেত্রের বাইরে বলে গণ্য হতে পারে। এই বই সেই পথে চলার বিপদ সম্পর্কে এক হুঁশিয়ারি।’

রণজয় সেন, আর্টিকল্‌স অব ফেথ: রিলিজয়ন, সেকুলারিজম অ্যাণ্ড দ্য ইণ্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্ট,
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, দিল্লি ২০১০।



সূত্র: আনন্দবাজার ডেইলি

No comments:

Post a Comment